ঢাকা , রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শক্তির রাজনীতি ও আগ্রাসনের ছায়া : পরবর্তী শিকার কোন দেশ ?

ছবি: মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু

বিশ্বরাজনীতির আকাশে আবারও অশনি-সংকেত। শক্তির প্রদর্শন, জোটের কৌশল, নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পৃথিবী যেন নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা, তা কেবল একটি রাষ্ট্রের সংকট নয়,  বরং এটি বিশ্বব্যবস্থার নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং শক্তির রাজনীতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় প্রধান ঘুঁটি। তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলকে পরিণত করেছে বৈশ্বিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বিশ্বশান্তির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার পররাষ্ট্রনীতির ভেতরকার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়।

একইভাবে ইসরাইল এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে নানা সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয়।

ইরান দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমা প্রভাববলয়ের বাইরে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক অবরোধ সহ সব মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে।

একদিকে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে কূটনৈতিক চাপ, এই দ্বিমুখী নীতির ফলে ইরানের জনগণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়লেও রাষ্ট্রটি তার সার্বভৌম অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে রাশিয়া ও চীন-এর উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব এখন আর একমেরু নয়, বহুমেরু বাস্তবতায় প্রতিটি জোটই কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিক সংঘাত কখনো সরাসরি যুদ্ধ, কখনো ‘প্রক্সি’ সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে, পরবর্তী লক্ষ্য কোথায়? দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি, সমুদ্রবন্দর, কৌশলগত অবস্থান এবং সম্ভাবনাময় খনিজসম্পদ কি নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে ? ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, কৌশলগত অবস্থান কখনো কখনো সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক সংযোগ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ শক্তির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে একথাও সত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল শক্তির খেলা নয়, এটি পারস্পরিক নির্ভরশীলতারও ক্ষেত্র। বৈশ্বিক অর্থনীতি এমনভাবে সংযুক্ত যে এক অঞ্চলের অস্থিরতা অন্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। তাই কোনো রাষ্ট্রের জন্য একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এই প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সংবেদনশীল। কৌশলগত ভারসাম্য, বহুমুখী কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, এই তিনটিই হতে পারে নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। উন্নয়ন-অভিযাত্রাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে আমাদের প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক বিচক্ষণতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলছে—সাম্রাজ্যবাদ কখনো শুধু অস্ত্রের শব্দে প্রকাশ পায় না, কখনো তা আসে অর্থনৈতিক চাপে, কখনো নিষেধাজ্ঞায়, কখনো তথ্যযুদ্ধে। তাই সচেতনতা, স্বচ্ছ নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকারই হতে পারে টেকসই নিরাপত্তার ভিত্তি।

শেষ প্রশ্নটি তাই আরও গভীর“এরপর কে?”

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কেবল শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলের ওপর নয়,  বরং ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো কতটা ঐক্যবদ্ধ, আত্মনির্ভর ও কূটনৈতিকভাবে প্রাজ্ঞ হতে পারে তার ওপরও। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে জাতি নিজের স্বার্থ রক্ষায় সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ, তাকে সহজে দাবার ঘুঁটি বানানো যায় না।

আজ প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রজ্ঞা,  শ্লোগান নয়, সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রনীতি।

বিশ্বব্যবস্থা যখন পুনর্গঠনের পথে, তখন আমাদেরও প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কতটুকু প্রস্তুত ? 

সর্বাধিক পঠিত

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে সংসদে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শক্তির রাজনীতি ও আগ্রাসনের ছায়া : পরবর্তী শিকার কোন দেশ ?

আপডেট হয়েছে : ০৯:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

বিশ্বরাজনীতির আকাশে আবারও অশনি-সংকেত। শক্তির প্রদর্শন, জোটের কৌশল, নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পৃথিবী যেন নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা, তা কেবল একটি রাষ্ট্রের সংকট নয়,  বরং এটি বিশ্বব্যবস্থার নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং শক্তির রাজনীতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় প্রধান ঘুঁটি। তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলকে পরিণত করেছে বৈশ্বিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বিশ্বশান্তির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার পররাষ্ট্রনীতির ভেতরকার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়।

একইভাবে ইসরাইল এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে নানা সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয়।

ইরান দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমা প্রভাববলয়ের বাইরে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক অবরোধ সহ সব মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে।

একদিকে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে কূটনৈতিক চাপ, এই দ্বিমুখী নীতির ফলে ইরানের জনগণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়লেও রাষ্ট্রটি তার সার্বভৌম অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে রাশিয়া ও চীন-এর উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব এখন আর একমেরু নয়, বহুমেরু বাস্তবতায় প্রতিটি জোটই কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিক সংঘাত কখনো সরাসরি যুদ্ধ, কখনো ‘প্রক্সি’ সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে, পরবর্তী লক্ষ্য কোথায়? দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি, সমুদ্রবন্দর, কৌশলগত অবস্থান এবং সম্ভাবনাময় খনিজসম্পদ কি নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে ? ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, কৌশলগত অবস্থান কখনো কখনো সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক সংযোগ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ শক্তির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে একথাও সত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল শক্তির খেলা নয়, এটি পারস্পরিক নির্ভরশীলতারও ক্ষেত্র। বৈশ্বিক অর্থনীতি এমনভাবে সংযুক্ত যে এক অঞ্চলের অস্থিরতা অন্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। তাই কোনো রাষ্ট্রের জন্য একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এই প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সংবেদনশীল। কৌশলগত ভারসাম্য, বহুমুখী কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, এই তিনটিই হতে পারে নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। উন্নয়ন-অভিযাত্রাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে আমাদের প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক বিচক্ষণতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলছে—সাম্রাজ্যবাদ কখনো শুধু অস্ত্রের শব্দে প্রকাশ পায় না, কখনো তা আসে অর্থনৈতিক চাপে, কখনো নিষেধাজ্ঞায়, কখনো তথ্যযুদ্ধে। তাই সচেতনতা, স্বচ্ছ নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকারই হতে পারে টেকসই নিরাপত্তার ভিত্তি।

শেষ প্রশ্নটি তাই আরও গভীর“এরপর কে?”

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কেবল শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলের ওপর নয়,  বরং ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো কতটা ঐক্যবদ্ধ, আত্মনির্ভর ও কূটনৈতিকভাবে প্রাজ্ঞ হতে পারে তার ওপরও। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে জাতি নিজের স্বার্থ রক্ষায় সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ, তাকে সহজে দাবার ঘুঁটি বানানো যায় না।

আজ প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রজ্ঞা,  শ্লোগান নয়, সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রনীতি।

বিশ্বব্যবস্থা যখন পুনর্গঠনের পথে, তখন আমাদেরও প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কতটুকু প্রস্তুত ?