বাংলাদেশ আজ এক ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রতিদিন সকালে চোখ মেললেই দেখা যাচ্ছে শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর। কোথাও সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর শিরশ্ছেদ করা হচ্ছে, কোথাও আবার লাশ ফেলে রাখা হচ্ছে জঙ্গল কিংবা ভুট্টাক্ষেতে। নিষ্পাপ শিশুর ছোট্ট শরীরগুলো আজ যেন বিকৃত মানসিকতার মানুষরূপী হায়েনাদের শিকারে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শিরশ্ছেদ করে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধীরা ধর্ষণের পর পরিচয় গোপন করতে শিশুটিকে হত্যা করে।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র। ঠাকুরগাঁওয়ে ধর্ষণের পর এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে ভুট্টাক্ষেত থেকে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিশু ইরাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও শনাক্ত হয়নি অপরাধীরা।
এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? যে দেশে শিশুরা নিজ ঘরেও নিরাপদ নয়, যে দেশে বাবা-মা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকেন, যে দেশে ধর্ষকের চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবার বেশি সামাজিক চাপে পড়ে, সেই সমাজ কীভাবে সভ্যতার দাবি করে? সেই সমাজের লোকজন কিভাবে ৭১ এবং ২৪ এর জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে?
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ১৬৫ শিশু ধর্ষণ বা হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে ধর্ষণের পর বা ধর্ষণের চেষ্টা প্রতিরোধ করায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ছিল ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিবেশী কিংবা নিকট আত্মীয় অথবা রাজনৈতিক মোড়লের পালিত জানোয়ার। অন্যদিকে শিশু অধিকার সংগঠন “শিশুরাই সব”-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১২৪ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
এ সমাজে কী ভয়ংকর নৈতিক পতন ঘটেছে, তা এসব পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে।
ধর্ষকরা আজ আর শুধু অপরাধী নয়; তারা ভয়হীন। কারণ তারা জানে, এই দেশে বিচার দীর্ঘ হয়, সাক্ষী হারিয়ে যায়, মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, আর প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা শেষ পর্যন্ত অনেক অপরাধীকেই বাঁচিয়ে দেয়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ধর্ষকদের আরও হিংস্র করে তুলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। কেউ লিখছেন, “বাংলাদেশে কী হচ্ছে?”, কেউ বলছেন, “শিশুরা কোথাও নিরাপদ নয়।” আবার অনেকে অভিযোগ করছেন, অসংখ্য ঘটনা লোকলজ্জা ও প্রভাবের কারণে প্রকাশই পায় না। আবার কেউ লিখছেন, ধর্ষকরা জেনে গেছে বাংলাদেশে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি কয়েকটা ফেইসবুক পোস্ট! এরপর কেল্লা ফতে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই দায় কার? শুধু কি ধর্ষকের?
নাকি সেই সমাজেরও, যারা অপরাধ দেখে চুপ থাকে?
নাকি সেই রাষ্ট্রের, যেখানে আইনের ভয় ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্টভাবে কাজ করছে:
- বিচারহীনতার সংস্কৃতি
- দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল বিচারব্যবস্থা
- সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়
- মাদক ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার
- পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতার অভাব
- রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে অপরাধীদের রক্ষা পাওয়া
আজ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেখে বিচার হলে অপরাধ কখনো কমবে না। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, প্রকাশ্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সর্বস্তরে সামাজিক প্রতিরোধ। পাশাপাশি পরিবারকে সচেতন হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে, মাদক ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং শিশুদের আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা—ধর্ষকের পরিচয় একটাই, সে ধর্ষক। তাকে কোনো দল, মত বা পরিচয়ের আড়ালে রক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ নিরাপত্তাহীনতায় কাঁদছে। এই কান্না শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির।
এখনও যদি রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষ একসঙ্গে জেগে না ওঠে, তাহলে প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনামে আরও অসংখ্য শিশুর রক্তাক্ত গল্প লেখা হবে।

এম সাহেদ চৌধুরী 











